প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে কর্মসংস্থানের ধরন। ঘরে বসেই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট তৈরি, গ্রাফিক ডিজাইনসহ নানা খাতে তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান। এই পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে সম্ভাবনা থাকলেও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকার অনেক নারী প্রযুক্তির ব্যবহার জানলেও সেটিকে আয়ের উৎস হিসেবে কীভাবে কাজে লাগাতে হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ থেকে পিছিয়ে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীদের প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের আওতায় এনে দক্ষ করে তুলতে পারলে কর্মসংস্থানের সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি তৈরি হবে নতুন নারী উদ্যোক্তা। বাড়বে পরিবারের আয়, শক্তিশালী হবে নারীর আর্থিক স্বাধীনতা। এর প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।
প্রযুক্তি হতে পারে আয়ের নতুন পথ
বর্তমানে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে ঘরে বসেই বিভিন্ন ধরনের কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, অনলাইন সেবা প্রদান, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, গ্রাফিক ডিজাইন, ডেটা এন্ট্রি, ওয়েবসাইট তৈরি ও অনলাইন টিউশনের মতো কাজের ক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে।
অনেক নারী ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ছোট পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। নিজেদের তৈরি পোশাক, খাবার, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য ও বিভিন্ন পণ্য অনলাইনে বিক্রি করে আয় করছেন তারা। প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো গেলে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে নেওয়া সম্ভব।
আরো পড়ুন >>> স্মার্টফোনে শিশুদের আসক্তি, কীভাবে দূর করবেন
ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাড়তে পারে অংশগ্রহণ
নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য ফ্রিল্যান্সিংও একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ থাকায় পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নারীরা এ খাতে যুক্ত হতে পারেন।
গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং, ডেটা এন্ট্রি ও ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে নারীদের একটি বড় অংশ অনলাইন শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারবেন।
তবে শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কাজ খোঁজা, ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ, ইংরেজি ভাষার ব্যবহার, অনলাইন পেমেন্ট এবং কাজের মান বজায় রাখার বিষয়েও বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
গ্রামীণ নারীদের জন্য বাড়াতে হবে সুযোগ
প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের। শহরে প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও প্রযুক্তিগত সুবিধা তুলনামূলক বেশি থাকলেও গ্রামের নারীরা নানা কারণে এসব সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকেন।
যাতায়াতের সমস্যা, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক সংকট ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক নারী প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পান না। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্র বাড়ানো গেলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।
অনলাইন ও অফলাইন প্রশিক্ষণের সমন্বয় এবং নারীদের সুবিধা অনুযায়ী সময়সূচি নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাড়বে নারীর আর্থিক স্বাধীনতা
প্রযুক্তিনির্ভর কাজের অন্যতম বড় সুবিধা হলো ঘরে বসে আয় করার সুযোগ। পরিবারের দায়িত্ব পালন করেও একজন নারী নির্দিষ্ট সময় কাজে ব্যয় করতে পারেন। এতে নিজের আয় তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ কমে।
নারীর আয় বাড়লে পরিবারে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বাড়ে। সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নারীর ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়। ফলে একজন নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন পুরো পরিবারের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
তৈরি হবে নতুন উদ্যোক্তা
প্রযুক্তি নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথও সহজ করে দিয়েছে। আগে ব্যবসা শুরু করতে দোকান, কর্মী ও বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হতো। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচে ব্যবসা শুরু করা সম্ভব।
একজন নারী ছোট পরিসরে অনলাইন ব্যবসা শুরু করে ধীরে ধীরে সেটিকে বড় প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে পারেন। ব্যবসা সম্প্রসারিত হলে অন্য নারীদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রশিক্ষণের পর সহায়তা জরুরি
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে। অনেক নারী প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে অর্থ, প্রযুক্তি ও বাজারসংযোগের সমস্যায় পড়েন।
তাই সহজ শর্তে ঋণ, উদ্যোক্তা সহায়তা, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, বাজারসংযোগ ও ব্যবসায়িক পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণেও সহায়তা করা দরকার।
ডিজিটাল নিরাপত্তায় গুরুত্ব
অনলাইনভিত্তিক কাজের সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সাইবার প্রতারণা, অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি ও অনলাইন হয়রানি থেকে সুরক্ষার বিষয়ে নারীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
নিরাপদ অনলাইন লেনদেন, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার এবং প্রতারণা শনাক্ত করার মতো বিষয়গুলো প্রশিক্ষণের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় অর্থনীতিতে বড় প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম নারীকে দক্ষ করে শ্রমবাজারে যুক্ত করা গেলে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে, বাড়বে কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি সম্প্রসারিত হবে।
আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন সেবা খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে। দক্ষ নারীরা দেশ-বিদেশের গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করে আয় করতে পারবেন।
আরো পড়ুন >>> হিমালয়ে হিমধসে নিহতদের উদ্ধারে প্রযুক্তির ব্যবহার
ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য প্রস্তুতি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল কমার্স ও অনলাইন সেবার বিস্তারে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নারীদের যুক্ত করতে এখন থেকেই প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
শুধু প্রাথমিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু নিয়মিত পরিবর্তন করতে হবে।
সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
নারীদের প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ সফল করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি সুবিধা, বাজারসংযোগ ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা গেলে প্রশিক্ষণের সুফল আরও বেশি পাওয়া সম্ভব।
সব মিলিয়ে নারীদের প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ শুধু কর্মসংস্থানের একটি মাধ্যম নয়; এটি নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার অন্যতম হাতিয়ার। পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দেশের বিপুলসংখ্যক নারী অর্থনীতির মূলধারায় আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে পারবেন।
নারীর হাতে প্রযুক্তির দক্ষতা তুলে দেওয়া মানে একটি পরিবারকে শক্তিশালী করা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা এবং দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেওয়া। তাই নারীদের প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ যত দ্রুত ও বিস্তৃত করা যাবে, দেশের অর্থনীতির চাকা ততই গতিশীল হবে।