হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হিমধস, হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার পর নিখোঁজ ও নিহতদের উদ্ধারে এখন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ধ্বংসস্তূপ, কাদা, বরফ ও পাথরের স্তরের নিচে আটকে থাকা মানুষকে শনাক্ত করা থেকে শুরু করে দুর্গম এলাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ সব ক্ষেত্রেই উদ্ধারকারীদের সহায়তা করছে আধুনিক প্রযুক্তি।
সাম্প্রতিক নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ দুর্যোগে বিপুল প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট প্রবল পানির স্রোত, কাদা ও পাথরের ঢলে সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। ফলে অনেক এলাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারছে না। এ অবস্থায় আকাশপথে নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ড্রোনে চলছে নিখোঁজদের অনুসন্ধান
উদ্ধার অভিযানে সবচেয়ে কার্যকর প্রযুক্তিগুলোর একটি হচ্ছে ড্রোন। পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টার নামার মতো জায়গা না থাকলেও ড্রোন আকাশ থেকে দুর্গম এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
নেপালে সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসের পর ড্রোন ব্যবহার করে জীবিতদের সন্ধান, ক্ষয়ক্ষতির মানচিত্র তৈরি এবং কাদা ও ধ্বংসস্তূপের গভীরতা নিরূপণের কাজ করা হচ্ছে। কিছু ড্রোনে থার্মাল ক্যামেরা ও LiDAR সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে। থার্মাল ক্যামেরা মানুষের শরীরের তাপ শনাক্ত করতে পারে, আর LiDAR প্রযুক্তি ধ্বংসস্তূপ ও ভূখণ্ডের ত্রিমাত্রিক তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করে।
রাতে বা ঘন কুয়াশার মধ্যেও থার্মাল ক্যামেরা বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কোনো মানুষের শরীরের তাপমাত্রার পার্থক্য শনাক্ত হলে উদ্ধারকারীরা সেই স্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে অনুসন্ধান চালাতে পারেন।
যেসব আইটি প্রশিক্ষণ বদলে দেবে জীবন
স্যাটেলাইটে দেখা যাচ্ছে ধ্বংসের চিত্র
হিমালয়ের মতো বিশাল ও দুর্গম অঞ্চলে স্যাটেলাইট ছবি উদ্ধারকারীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কোনো এলাকা ভূমিধস বা বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে কোথায় রাস্তা বা সেতু ধ্বংস হয়েছে, কোথায় নতুন ভূমিধস হয়েছে এবং কোথায় পানির প্রবাহের পরিবর্তন ঘটেছে তা বোঝা যায়।
সাম্প্রতিক নেপাল-তিব্বত দুর্যোগে স্যাটেলাইট চিত্রে হিমবাহ ও পাহাড়ি ভূখণ্ডের বড় ধরনের পরিবর্তন শনাক্ত হয়েছে। এসব তথ্য দুর্যোগের উৎস এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বোঝার পাশাপাশি উদ্ধারকারী দলকে নিরাপদ রুট নির্ধারণেও সহায়তা করছে।
নেপাল বর্তমানে নতুন করে সৃষ্ট একটি ঝুঁকিপূর্ণ জলাধার বা ব্যারিয়ার লেকের পরিস্থিতিও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ ওই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নতুন করে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।
রাডার প্রযুক্তিতে বরফের নিচে অনুসন্ধান
বরফের নিচে মানুষ আটকা পড়লে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দ্রুত কমে যায়। এ ক্ষেত্রে RECCO-এর মতো রাডারভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়।
এই ব্যবস্থায় উদ্ধারকারীদের হাতে থাকা ডিটেক্টর একটি নির্দিষ্ট রাডার সংকেত পাঠায়। পর্বতারোহী বা অভিযাত্রীর পোশাকে থাকা বিশেষ প্রতিফলক সেই সংকেত প্রতিফলিত করলে উদ্ধারকারী তার অবস্থান শনাক্ত করতে পারেন। নেপালের বিভিন্ন পর্বতারোহণ এলাকায় RECCO ডিটেক্টর মোতায়েন রয়েছে এবং ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ১৩টি ডিটেক্টর ও কাঠমান্ডুভিত্তিক একটি হেলিকপ্টার ডিটেক্টর ব্যবস্থার কথা জানানো হয়েছিল।
তবে এ প্রযুক্তি তখনই সবচেয়ে কার্যকর, যখন নিখোঁজ ব্যক্তির পোশাক বা সরঞ্জামে RECCO প্রতিফলক থাকে। এটি প্রচলিত অ্যাভালাঞ্চ ট্রান্সসিভারের বিকল্প নয়; বরং উদ্ধার ব্যবস্থার একটি অতিরিক্ত প্রযুক্তি।
প্রযুক্তি যেভাবে হয়ে উঠছে চাকরির প্রধান হাতিয়ার
হেলিকপ্টার থেকে প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকারীরা অনেক সময় হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রবল বাতাস, খারাপ আবহাওয়া এবং অবতরণের জায়গার অভাবে সরাসরি উদ্ধার সম্ভব হয় না।
এ কারণে হেলিকপ্টার থেকে বিশেষ সেন্সর বা ডিটেক্টর ব্যবহার করে নিখোঁজদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়। RECCO-এর হেলিকপ্টার ডিটেক্টরও এ ধরনের অনুসন্ধানের জন্য তৈরি করা হয়েছে। নেপালে এ ধরনের সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার ফলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত অনুসন্ধানের সুযোগ বেড়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা
ভবিষ্যতে উদ্ধার অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ড্রোন ও স্যাটেলাইট থেকে প্রতি ঘণ্টায় বিপুল পরিমাণ ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব। মানুষের পক্ষে এসব ছবি দ্রুত বিশ্লেষণ করা কঠিন হলেও AI অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কয়েক মিনিটে হাজারো ছবি বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক স্থান চিহ্নিত করা সম্ভব।
AI ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অস্বাভাবিক বস্তু, মানুষের উপস্থিতির সম্ভাব্য চিহ্ন, নতুন ফাটল বা ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল শনাক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবি তুলনা করে কোন এলাকায় সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন ঘটেছে, তাও নির্ধারণ করা সম্ভব।
ভূমিকম্প ও ভূমিধসের আগাম সতর্কতা
প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজেই সীমাবদ্ধ নয়। হিমালয়ে ভূমিকম্প, ভূমিধস ও হিমবাহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভূকম্পন সেন্সর, পানির স্তর পরিমাপক, আবহাওয়া স্টেশন ও স্যাটেলাইট ডেটা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে আগাম সতর্কতা দেওয়া যায়। চীনে মহাকাশ-আকাশ-ভূমি সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থায় সিসমিক ও হাইড্রোলজিক্যাল সেন্সর এবং BeiDou-ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞান ও কোরআন: জ্ঞান, সৃষ্টি ও মহাবিশ্বের রহস্য অনুসন্ধানে এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি
প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক দক্ষতাও জরুরি
তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, হিমালয়ের মতো দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী, চিকিৎসক, পর্বতারোহী ও স্থানীয় মানুষের ভূমিকা অপরিহার্য। ড্রোন বা স্যাটেলাইট কোনো মানুষকে সরাসরি ধ্বংসস্তূপ থেকে তুলে আনতে পারে না; এগুলো উদ্ধারকারীদের সঠিক জায়গা শনাক্ত করতে সহায়তা করে।
সাম্প্রতিক দুর্যোগে অতিরিক্ত বন্যা ও নতুন ভূমিধসের আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিতও করতে হয়েছে। অর্থাৎ উদ্ধারকারীদের নিজেদের নিরাপত্তাও বড় বিষয়।
সব মিলিয়ে হিমালয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রযুক্তি এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জীবন বাঁচানোর গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ড্রোন দ্রুত অনুসন্ধান চালাচ্ছে, স্যাটেলাইট ধ্বংসের মানচিত্র তৈরি করছে, থার্মাল ক্যামেরা জীবিতদের সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করছে এবং রাডারভিত্তিক প্রযুক্তি বরফের নিচে চাপা পড়া পর্বতারোহীদের খুঁজে বের করতে সহায়তা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে স্থানীয় উদ্ধারকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত করা গেলে হিমালয়ের ভবিষ্যৎ দুর্যোগে প্রাণহানি কমানো এবং নিখোঁজদের দ্রুত শনাক্ত করার সক্ষমতা অনেক বাড়ানো সম্ভব।