দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং প্রযুক্তি আমদানিতে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে ইরান। সামরিক প্রযুক্তি থেকে মহাকাশ গবেষণা, ন্যানোপ্রযুক্তি থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞান—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশটি স্থানীয়ভাবে গবেষণা, উদ্ভাবন ও উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছে।

ইরানের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো ড্রোন প্রযুক্তি। বিভিন্ন ধরনের নজরদারি ও আক্রমণাত্মক ড্রোন তৈরি ও ব্যবহারে দেশটি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা যায়—এমন মনুষ্যবিহীন উড়োজাহাজকে দীর্ঘ সময় আকাশে রাখার সক্ষমতা ইরানের সামরিক প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে আলোচিত।

ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে দীর্ঘ পথ

ইরানের আরেকটি বড় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা হলো ক্ষেপণাস্ত্র। দেশটি স্বল্প ও মধ্যপাল্লার বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি নির্ভুলতা, নির্দেশনা ও উৎক্ষেপণ প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করেছে। এ খাতকে ইরান তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। তবে ইরানের সামরিক প্রযুক্তির বিষয়ে দেশটির সরকারি দাবি, বিদেশি বিশ্লেষণ এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে বিভিন্ন সক্ষমতার দাবি মূল্যায়নে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

আরো পড়ুন: ঘরে বসে হালাল উপার্জন: ফ্রিল্যান্সিংয়ে কোন কাজগুলো শতভাগ নিরাপদ ও হালাল?

মহাকাশে ইরানের পদচিহ্ন

মহাকাশ প্রযুক্তিতেও ইরানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। দেশটি নিজস্ব স্যাটেলাইট তৈরি ও উৎক্ষেপণের পাশাপাশি উৎক্ষেপণযান প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে। মহাকাশ কর্মসূচির মাধ্যমে যোগাযোগ, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে তেহরান।

ইরানের জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পরিকল্পনায় মহাকাশ প্রযুক্তিকে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

ন্যানো প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ

সামরিক প্রযুক্তির বাইরে ইরানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির একটি হলো ন্যানোপ্রযুক্তি। দেশটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ন্যানো গবেষণাকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। ন্যানোপ্রযুক্তির গবেষণা, শিল্পায়ন, বাণিজ্যিকীকরণ এবং পণ্য রপ্তানিকে কেন্দ্র করে দেশটির আলাদা জাতীয় কর্মসূচিও রয়েছে।

ন্যানো উপাদান ব্যবহার করে পানি পরিশোধন, চিকিৎসা, কৃষি, নির্মাণ, বস্ত্র ও শিল্পকারখানায় বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ গবেষণাগারের প্রযুক্তিকে বাস্তব পণ্যে রূপান্তর করাই ইরানের ন্যানো কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।

চিকিৎসাবিজ্ঞানেও অগ্রগতি

জীবপ্রযুক্তি, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং চিকিৎসা গবেষণায়ও ইরান নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। বিদেশি প্রযুক্তি আমদানির সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পণ্য ও প্রযুক্তি তৈরির ওপর দেশটির গুরুত্ব বেড়েছে।

বিশেষ করে জৈবপ্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাকে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন: চাঁদে ফেরার পথে নতুন অধ্যায়: পৃথিবীর কক্ষপথে হবে মহাকাশচারীদের চূড়ান্ত মহড়া

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তি

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত উপকরণ, মাইক্রোইলেকট্রনিকস, জীবপ্রকৌশল ও মস্তিষ্কবিষয়ক প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইরানের সাম্প্রতিক প্রযুক্তি নীতিতেও এসব ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, সেন্সর, তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ ও মনুষ্যবিহীন প্রযুক্তির সমন্বয় ভবিষ্যতে ইরানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

নিষেধাজ্ঞাই কি প্রযুক্তির বিকল্প পথ তৈরি করেছে?

ইরানের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা। বিদেশ থেকে সব ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি বা প্রযুক্তি সহজে সংগ্রহ করতে না পারায় দেশটি অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন ও প্রকৌশল সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ঝুঁকেছে।

এতে সব ক্ষেত্রে বিশ্বমানের প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে—এমন দাবি করা ঠিক নয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সীমাবদ্ধতার মধ্যে প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা ইরানের নিজস্ব গবেষণা ও উৎপাদন অবকাঠামো গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।

আসল কারিশমা কোথায়?

ইরানের প্রযুক্তিগত গল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সীমাবদ্ধতার মধ্যে প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মহাকাশ, ন্যানোপ্রযুক্তি থেকে জীবপ্রযুক্তি—বিভিন্ন খাতে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

তবে ইরানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে আলোচনায় অতিরঞ্জিত দাবি এড়িয়ে চলা জরুরি। কোথাও দেশটির নিজস্ব সক্ষমতা শক্তিশালী, আবার কোথাও বিদেশি প্রযুক্তি, উপাদান বা জ্ঞান ব্যবহারের প্রশ্ন রয়েছে।

সব মিলিয়ে ইরান দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কোনো দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রাকে কঠিন করে তুলতে পারে, কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা থামিয়ে দিতে পারে না। আর এই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় ইরানের উত্থান এখন বিশ্বের নজর কাড়ছে।