মানুষের শরীরের প্রতিটি অঙ্গই বিস্ময়কর। চোখের মণি, কণ্ঠস্বর, মুখাবয়ব কিংবা ডিএনএর মতোই মানুষের পরিচয় বহন করে আঙুলের ছাপ। পৃথিবীর একজন মানুষের আঙুলের ছাপ আরেকজনের সঙ্গে হুবহু মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। এমনকি অভিন্ন যমজদের ক্ষেত্রেও আঙুলের ছাপ এক নয়। আধুনিক বিজ্ঞান এই স্বাতন্ত্র্যকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে অপরাধ তদন্ত, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ব্যাংকিং ও প্রযুক্তির নানা ক্ষেত্রে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করছে।
আঙুলের ডগায় থাকা অসংখ্য সূক্ষ্ম রেখার বিন্যাস মানুষের পরিচয়ের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। কিন্তু বহু শতাব্দী আগে অবতীর্ণ আল-কোরআনের একটি আয়াত মানুষের পুনরুত্থান প্রসঙ্গে বিশেষভাবে আঙুলের ডগার কথা উল্লেখ করেছে। এ কারণে কোরআনের ওই আয়াতটি নিয়ে ধর্মীয় চিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্ক আলোচনায় বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-কিয়ামাহর ৩ ও ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারব না? অবশ্যই পারব। আমি তার আঙুলের ডগাগুলো পর্যন্ত যথাযথভাবে পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম।”
এই আয়াতের মূল বক্তব্য মানুষের মৃত্যুর পর পুনরুত্থান নিয়ে। মানুষ মনে করতে পারে, মৃত্যুর পর যখন শরীরের হাড়গুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে, তখন সেগুলো আবার কীভাবে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব? আল্লাহ তাআলা সেই সংশয়ের জবাবে জানান, মানুষের হাড়গুলো পুনর্গঠন করা তো তাঁর জন্য সম্ভবই; এমনকি মানুষের আঙুলের ডগার মতো সূক্ষ্ম অংশও তিনি পুনর্গঠন করতে সক্ষম।
আরো পড়ুন: মানব শরীর: সৃষ্টির মহাবিস্ময়কর প্রযুক্তি
আঙুলের ছাপ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আঙুলের ডগা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্য। আঙুলের ত্বকে থাকা উঁচু-নিচু রেখাগুলোকে সাধারণভাবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বলা হয়। এসব রেখার বিন্যাস, বাঁক, শাখা-প্রশাখা ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তৈরি করে।
মানুষের গর্ভকালেই আঙুলের ছাপের মৌলিক বিন্যাস তৈরি হতে শুরু করে। জন্মের পর থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় তা দীর্ঘ সময় অপরিবর্তিত থাকে। ত্বকের ওপরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গভীর স্তরের গঠন অক্ষত থাকলে আগের বৈশিষ্ট্য আবার ফিরে আসতে পারে।
এই স্বাতন্ত্র্যের কারণেই আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানে আঙুলের ছাপ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোনো অপরাধস্থলে পাওয়া আঙুলের ছাপের সঙ্গে সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছাপ মিলিয়ে পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। একইভাবে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে বায়োমেট্রিক প্রযুক্তিতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করা হয়।
আজ মোবাইল ফোনের নিরাপত্তা, কর্মস্থলে উপস্থিতি, সরকারি সেবার পরিচয় যাচাই, ব্যাংকিং ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় আঙুলের ছাপ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। অর্থাৎ মানুষের শরীরে থাকা একটি ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্য আধুনিক প্রযুক্তিতে পরিচয় শনাক্তকরণের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
কোরআনে ‘আঙুলের ডগা’র উল্লেখ
সূরা আল-কিয়ামাহর আয়াত দুটির প্রেক্ষাপট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে মানুষের প্রশ্ন বা সংশয় হচ্ছে—মৃত্যুর পর তার হাড়গুলো যখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে, তখন কি আল্লাহ সেগুলো পুনরায় একত্র করতে পারবেন?
এর উত্তরে আল্লাহ তাআলা শুধু হাড় একত্র করার কথা বলেননি। বরং বলেছেন, তিনি মানুষের আঙুলের ডগা পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম।
আরবি আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে ‘বনান’ শব্দ। এর অর্থ আঙুলের ডগা বা আঙুলের প্রান্ত। তাফসিরের আলোচনায় এই শব্দের মাধ্যমে মানুষের আঙুলের সূক্ষ্মতা ও গঠনকে বোঝানো হয়েছে। মূল বিষয় হলো মানুষের শরীর পুনরায় সৃষ্টি করা আল্লাহর জন্য কোনো কঠিন বিষয় নয়। তাঁর ক্ষমতার কাছে মানুষের শরীরের ক্ষুদ্রতম অংশও পুনর্গঠন করা সম্ভব।
আরো পড়ুন: কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য আইটি প্রশিক্ষণে নতুন সম্ভাবনা
বিজ্ঞান কি কোরআনের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেয়?
আধুনিক বিজ্ঞানে আঙুলের ছাপের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনেকেই সূরা আল-কিয়ামাহর ওই আয়াতের সঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্টের বিষয়টির সম্পর্ক তুলে ধরেন। বিশেষ করে আঙুলের ডগার অনন্য রেখাবিন্যাসের কথা সামনে রেখে আয়াতটির গভীরতা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
তবে এ ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। কোরআন মূলত হেদায়াতের গ্রন্থ; এটি জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান বা ফরেনসিক বিজ্ঞানের পাঠ্যবই নয়। তাই আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো আবিষ্কারকে জোর করে একটি আয়াতের সঙ্গে মিলিয়ে সেটিকে সরাসরি ‘বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যদ্বাণী’ বলা সতর্কতার দাবি রাখে।
কোরআনের আয়াতের সরাসরি উদ্দেশ্য হলো মানুষের পুনরুত্থানের বিষয়টি স্পষ্ট করা। আয়াতটি জানিয়ে দিচ্ছে—যিনি প্রথমবার মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি মৃত্যুর পর তাকে পুনরায় সৃষ্টি করতে অবশ্যই সক্ষম। আঙুলের ডগার উল্লেখ সেই ক্ষমতার ব্যাপ্তি বোঝাতে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি উদাহরণ।
মানুষের পরিচয়ের অনন্য চিহ্ন
মানুষকে আলাদা করে চেনার ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপের ভূমিকা আধুনিক যুগে আরও স্পষ্ট হয়েছে। একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও আঙুলের ছাপ আলাদা। অভিন্ন যমজ সন্তানদের জিনগত বৈশিষ্ট্য অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত কাছাকাছি হলেও তাদের আঙুলের ছাপ অভিন্ন হয় না।
এর ফলে একজন মানুষের শরীরে এমন একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা তাকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়। আধুনিক বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি এই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত পরিচয় যাচাই করতে পারছে।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণে শুধু একটি রেখা নয়; বরং অসংখ্য সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যের সমন্বিত বিন্যাস বিশ্লেষণ করা হয়। রেখার শুরু, শেষ, বিভাজন, বাঁক ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে একটি ছাপের স্বাতন্ত্র্য নির্ধারণ করা হয়।
মানবদেহের এত ছোট একটি অংশে এমন জটিল ও ব্যক্তিভেদে আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকা সৃষ্টির সূক্ষ্মতার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
অপরাধ তদন্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট
ফরেনসিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে আঙুলের ছাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। অপরাধের ঘটনাস্থলে কোনো ব্যক্তি কোনো বস্তু স্পর্শ করলে সেখানে তার আঙুলের ছাপ থেকে যেতে পারে। তদন্তকারীরা এসব ছাপ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেন।
অবশ্য কোনো স্থানে আঙুলের ছাপ পাওয়া গেলেই সেটি অপরাধ সংঘটনের চূড়ান্ত প্রমাণ—এমনটি বলা যায় না। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, ছাপটি কীভাবে সেখানে এসেছে এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য সবকিছু বিবেচনা করতে হয়।
তবু ব্যক্তি শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে ব্যাপক। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও আরও উন্নত হয়েছে।
আরো পড়ুন: চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্য, বদলে যাচ্ছে চিকিৎসার চিত্র
প্রযুক্তির সঙ্গে ধর্মীয় চিন্তার সংযোগ
আঙুলের ছাপের প্রসঙ্গটি ধর্মীয় চিন্তার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির একটি আকর্ষণীয় সংযোগ তৈরি করে। একদিকে বিজ্ঞান মানুষের শরীরের সূক্ষ্ম গঠন পর্যবেক্ষণ করছে, অন্যদিকে কোরআন মানুষকে তার সৃষ্টির নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে।
কোরআনে বারবার মানুষকে আকাশ, পৃথিবী, প্রাণী ও নিজের সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতে বলা হয়েছে। মানুষের নিজের শরীরও সেই চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
একটি আঙুলের ডগায় অসংখ্য সূক্ষ্ম রেখা—দেখতে সাধারণ হলেও এর স্বাতন্ত্র্য ও স্থায়িত্ব মানুষের জন্য বিস্ময়ের বিষয়। একজন মানুষ তার আঙুলের ছাপ দিয়ে নিজেকে শনাক্ত করতে পারে, আবার সেই আঙুলের ডগার কথাই কোরআনে মানুষের পুনরুত্থানের আলোচনায় এসেছে।
পুনরুত্থানের বিশ্বাসই আয়াতের মূল বার্তা
তবে আয়াতটির কেন্দ্রবিন্দু ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি নয়; বরং আখিরাত ও পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাস। কোরআন মানুষের একটি মৌলিক প্রশ্নের জবাব দিয়েছে—মৃত্যুর পর কি মানুষ আবার জীবিত হবে?
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, অবশ্যই হবে। মানুষের দেহ মাটিতে মিশে গেলেও আল্লাহ তাকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন। মানুষের অস্তিত্বের কোনো অংশই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। তাই একজন মানুষের পরিচয়, তার দেহের গঠন এবং তার ক্ষুদ্রতম বৈশিষ্ট্য—সবই আল্লাহর জ্ঞাত।
এই অর্থে আঙুলের ডগার উল্লেখ মানুষের জন্য একটি গভীর চিন্তার বিষয়। মানুষ যেখানে নিজের পরিচয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশকে প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর কাছে মানুষের পূর্ণ পরিচয় ও অস্তিত্ব কোনোভাবেই অজানা নয়।
সৃষ্টি নিয়ে ভাবার আহ্বান
আঙুলের ছাপ আমাদের প্রতিদিনের জীবনে এত পরিচিত যে এর বিস্ময়কর দিক অনেক সময় চোখে পড়ে না। মোবাইলের পর্দা খুলতে কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি দিতে আমরা আঙুল রাখি। কিন্তু সেই আঙুলের ডগার রেখাগুলো কীভাবে একজন মানুষকে অন্যজনের চেয়ে স্বতন্ত্র করে তুলছে তা ভাবলে সৃষ্টির সূক্ষ্মতা নতুনভাবে উপলব্ধি করা যায়।
আল-কোরআনের আয়াতটি সেই উপলব্ধির একটি সুযোগ তৈরি করে। আয়াতটি বিজ্ঞান শেখানোর উদ্দেশ্যে নয়; বরং মানুষের সংশয় দূর করে আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করানোর জন্য। আধুনিক বিজ্ঞানের জ্ঞান আমাদের আঙুলের ছাপের বৈশিষ্ট্য বুঝতে সাহায্য করেছে, আর কোরআনের আয়াত মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তা ও পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
সবশেষে বলা যায়, মানুষের আঙুলের ডগার ক্ষুদ্র রেখাগুলো শুধু পরিচয় শনাক্তকরণের প্রযুক্তিগত উপাদান নয়; এগুলো সৃষ্টির সূক্ষ্মতা নিয়েও ভাবার উপলক্ষ। সূরা আল-কিয়ামাহর ৩–৪ নম্বর আয়াত মানুষের পুনরুত্থানের সত্যকে সামনে এনে মনে করিয়ে দেয়—মানুষের দেহ যতই ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হোক, তার সৃষ্টিকর্তার কাছে তাকে পুনরায় সৃষ্টি করা অসম্ভব নয়।
আঙুলের ডগা থেকে মানুষের পরিচয় শনাক্ত করতে পারে আধুনিক প্রযুক্তি; আর সেই আঙুলের ডগার কথাই কোরআন মানুষকে পুনরুত্থানের সত্য স্মরণ করিয়ে দিতে ব্যবহার করেছে। সৃষ্টির এই সূক্ষ্মতার দিকে তাকিয়ে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—নিজের অস্তিত্ব ও সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবা।