মানুষ প্রযুক্তির জগতে যতই এগিয়ে যাচ্ছে, ততই ফিরে তাকাতে হচ্ছে প্রকৃতির দিকে। আকাশে উড়তে চেয়েছে মানুষ শিখেছে পাখির কাছ থেকে। অন্ধকারে পথ খুঁজতে চেয়েছে অনুপ্রেরণা পেয়েছে বাদুড়ের কাছ থেকে। পানিতে দ্রুত চলার প্রযুক্তি তৈরি করতে গিয়ে গবেষকেরা তাকিয়েছেন মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর দিকে। এমনকি মানুষের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পেছনেও রয়েছে মানুষের নিজের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি বোঝার দীর্ঘ প্রচেষ্টা।

প্রকৃতি কোটি কোটি বছর ধরে নিজস্ব নিয়মে নানা প্রাণী, উদ্ভিদ ও জীবব্যবস্থাকে অভিযোজিত করেছে। কোথাও তৈরি হয়েছে শক্ত অথচ হালকা কাঠামো, কোথাও পানিরোধী পৃষ্ঠ, কোথাও অতি দ্রুত চলার কৌশল, আবার কোথাও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ ব্যবস্থা। আধুনিক বিজ্ঞানীরা সেই নকশা, কৌশল ও প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে তৈরি করছেন নতুন প্রযুক্তি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই ধারাকে বলা হয় বায়োমিমিক্রি অর্থাৎ প্রকৃতির নকশা ও কার্যপদ্ধতি থেকে মানুষের প্রযুক্তির জন্য শিক্ষা নেওয়া।

পাখির ডানা দেখে আকাশ জয়

মানুষের উড্ডয়নের ইতিহাসের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক সবচেয়ে স্পষ্ট। শত শত বছর ধরে মানুষ পাখিকে দেখে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখেছে। পরে বিজ্ঞানীরা পাখির ডানার গঠন, বাতাসের প্রবাহ এবং উড্ডয়নের নীতিগুলো বিশ্লেষণ করে উড়োজাহাজের প্রযুক্তি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পান।

আধুনিক উড়োজাহাজ অবশ্য সরাসরি কোনো পাখির অনুকরণ নয়। এর পেছনে রয়েছে জটিল বায়ুগতিবিদ্যা, প্রকৌশল ও গণিত। কিন্তু পাখির ডানা যে মানুষকে উড্ডয়নের ধারণা দিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।

আজ শুধু উড়োজাহাজ নয়, ড্রোন, রোবটিক উড়ন্ত যান এবং বিভিন্ন ধরনের উড্ডয়ন প্রযুক্তিতেও প্রকৃতির প্রাণীদের গতিবিধি গবেষণা করা হচ্ছে।

আরো পড়ুন: তথ্যপ্রযুক্তির প্রাণ অনলাইন গণমাধ্যম

বাদুড়ের প্রতিধ্বনি থেকে রাডার

রাতের অন্ধকারে বাদুড় কীভাবে পথ হারায় না? এই প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিন আগ্রহী করেছে।

বাদুড় উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে। সেই শব্দ কোনো বস্তুর ওপর আঘাত করে ফিরে এলে তার প্রতিধ্বনি থেকে বাদুড় আশপাশের বস্তুর অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পায়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ইকোলোকেশন।

মানুষ পরে শব্দ ও তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ ব্যবহার করে দূরের বস্তুর অবস্থান শনাক্ত করার প্রযুক্তি তৈরি করেছে। রাডার ও সোনার প্রযুক্তি সরাসরি বাদুড়ের প্রযুক্তির অনুলিপি নয়, তবে জীবজগতের প্রতিধ্বনি-নির্ভর অবস্থান শনাক্তকরণ বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা তৈরি করেছে।

আজ বিমান চলাচল, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, সমুদ্র অনুসন্ধান ও সামরিক-বেসামরিক নানা ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে।

পদ্মপাতা শেখাচ্ছে পানিরোধী প্রযুক্তি

পুকুরের পানিতে পদ্মপাতা দেখলে মনে হয় পাতার ওপর পানি সহজেই ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় পানির ফোঁটা পাতার ওপর গোল হয়ে থাকে এবং গড়িয়ে পড়ে। এর পেছনে রয়েছে পাতার অতি সূক্ষ্ম পৃষ্ঠগঠন।

পদ্মপাতার এই বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করেছে এমন সব পৃষ্ঠ তৈরি করতে, যেখানে পানি ও ময়লা সহজে আটকে থাকতে পারে না।

এ ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে ভবনের দেয়াল, কাচ, পোশাক, যানবাহন এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্যে ব্যবহারযোগ্য নতুন উপাদান তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ একটি সাধারণ পাতা হয়ে উঠেছে আধুনিক উপাদানবিজ্ঞানের গবেষণার অনুপ্রেরণা।

মাকড়সার জালে লুকিয়ে শক্তির রহস্য

দেখতে সূক্ষ্ম ও কোমল মাকড়সার জাল। কিন্তু কিছু ধরনের মাকড়সার রেশমের যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিন ধরে বিস্মিত করে আসছে।

অতি কম ওজনের একটি উপাদান কীভাবে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও নমনীয় হতে পারে—মাকড়সার রেশম এই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

গবেষকেরা কৃত্রিমভাবে মাকড়সার রেশমের মতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উপাদান তৈরির চেষ্টা করছেন। ভবিষ্যতে হালকা অথচ শক্তিশালী উপাদান তৈরিতে এসব গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরো পড়ুন: আসামি ধরতে পুলিশের হাতে আধুনিক প্রযুক্তির ১৫ অস্ত্র

গেকোর পা থেকে আঠার নতুন ধারণা

দেয়াল বেয়ে অনায়াসে উঠে যায় গেকো। কিন্তু তার পায়ে প্রচলিত অর্থে কোনো আঠা নেই। তার পায়ের সূক্ষ্ম গঠন ও পৃষ্ঠের সঙ্গে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মিথস্ক্রিয়ার কারণে সে বিভিন্ন পৃষ্ঠে আটকে থাকতে পারে।

এই বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করেছে ‘শুকনো আঠা’ বা dry adhesive তৈরির গবেষণায়।

এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন গ্রিপিং ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা রোবট, শিল্পকারখানা ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে কাজে লাগবে।

মানুষের মস্তিষ্ক থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

আজকের পৃথিবীর অন্যতম আলোচিত প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এর পেছনেও প্রকৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে বিশেষ করে মানব মস্তিষ্কের।

মানুষ কীভাবে তথ্য গ্রহণ করে, সংকেত বিশ্লেষণ করে, অভিজ্ঞতা থেকে শেখে এবং সিদ্ধান্ত নেয়—এসব বোঝার চেষ্টা থেকেই কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের ধারণা বিকশিত হয়েছে।

বর্তমান এআই মানুষের মস্তিষ্কের হুবহু অনুকরণ নয়। কিন্তু নিউরনের পারস্পরিক যোগাযোগ ও শেখার ধারণা কম্পিউটার বিজ্ঞানে নতুন পথ খুলে দিয়েছে।

ছবি শনাক্তকরণ থেকে ভাষা বিশ্লেষণ, চিকিৎসা গবেষণা থেকে স্বয়ংক্রিয় যান বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

চোখ থেকে ক্যামেরা, দৃষ্টি থেকে কম্পিউটার ভিশন

মানুষের চোখ আলো গ্রহণ করে এবং মস্তিষ্ক সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে দৃশ্যের অভিজ্ঞতা তৈরি করে। এই জটিল প্রক্রিয়া বিজ্ঞানীদের ক্যামেরা, ইমেজ প্রসেসিং এবং কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তি উন্নয়নে অনুপ্রাণিত করেছে।

আধুনিক ক্যামেরা মানুষের চোখের মতো নয়। তবে আলো, ফোকাস, রঙ এবং দৃশ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মানবদৃষ্টির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রযুক্তির গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখন এমন কম্পিউটার ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যা ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে বস্তু, মুখ বা বিভিন্ন ধরনের দৃশ্য শনাক্ত করতে পারে।

মাছ থেকে দ্রুতগতির যান

পানির নিচে মাছের চলাচল দীর্ঘদিন ধরে প্রকৌশলীদের আকৃষ্ট করেছে। মাছ কীভাবে পানির প্রতিরোধ অতিক্রম করে দ্রুত এগিয়ে যায়, কীভাবে শরীর বাঁকিয়ে দিক পরিবর্তন করে—এসব নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

এই গবেষণা থেকে জলযান ও পানির নিচে চলাচলকারী বিভিন্ন প্রযুক্তির নকশায় ধারণা নেওয়া হয়েছে।

জাপানের দ্রুতগতির ট্রেনের নকশার ক্ষেত্রেও প্রকৃতির অনুপ্রেরণার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে। ট্রেনের সামনের অংশের নকশায় এমন আকৃতি নেওয়া হয়েছিল, যা পানিতে দ্রুতগতিতে ডুব দেওয়া একটি পাখির ঠোঁটের আকৃতির সঙ্গে তুলনীয়। এর ফলে সুড়ঙ্গ থেকে বের হওয়ার সময় শব্দ ও বায়ুচাপের সমস্যা কমাতে সহায়তা পাওয়া যায়।

আরো পড়ুন: মানব শরীর: সৃষ্টির মহাবিস্ময়কর প্রযুক্তি

সৌরশক্তি: প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শক্তিকেন্দ্র

পৃথিবীর সবুজ উদ্ভিদ কোটি কোটি বছর ধরে সূর্যের আলোকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তর করে আসছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সালোকসংশ্লেষণ।

মানুষ এখন সৌর প্যানেলের মাধ্যমে সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তর করছে। যদিও সৌর প্যানেল উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণের সরাসরি অনুকরণ নয়, প্রকৃতির শক্তি ব্যবহারের পদ্ধতি বিজ্ঞানীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।

বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরশক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতের টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় এর ভূমিকা আরও বাড়তে পারে।

মানবদেহও প্রযুক্তির শিক্ষক

প্রকৃতি বলতে শুধু বন, পাহাড়, নদী বা প্রাণী নয় মানবদেহও প্রকৃতির অসাধারণ এক সৃষ্টি।

হৃদ্‌যন্ত্রের স্বয়ংক্রিয় স্পন্দন, মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, চোখের দৃষ্টিশক্তি, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, ক্ষত সারানোর ক্ষমতা—এসব নিয়েও বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন।

কৃত্রিম অঙ্গ, বায়োনিক হাত-পা, কৃত্রিম হৃদ্‌যন্ত্র, রোবটিক সার্জারি ও ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেসের মতো প্রযুক্তির বিকাশে মানবদেহ সম্পর্কে জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশেষ করে বায়োনিক অঙ্গের ক্ষেত্রে লক্ষ্য হলো এমন প্রযুক্তি তৈরি করা, যা শুধু শরীরের হারানো অংশের কাজই করবে না; বরং ব্যবহারকারীর স্নায়ুতন্ত্রের সংকেত বুঝে আরও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবে।

প্রকৃতি যখন গবেষণাগার

প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সব সমস্যার সমাধান শক্তি প্রয়োগ করে করতে হয় না। অনেক সময় দক্ষ নকশা, অভিযোজন ও সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মধ্যেই সমাধান লুকিয়ে থাকে।

পাখি কম শক্তি ব্যবহার করে দীর্ঘ পথ উড়ে যায়। গাছ সূর্যের আলো ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে। মরুভূমির প্রাণী অল্প পানিতে বেঁচে থাকে। মেরু অঞ্চলের প্রাণী তীব্র ঠান্ডার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। গাছের পাতা সূর্যের আলো সংগ্রহ করে, আবার শিকড় মাটি থেকে পানি ও খনিজ সংগ্রহ করে।

এসব প্রক্রিয়া বিজ্ঞানীদের সামনে এক বিশাল গবেষণাক্ষেত্র খুলে দিয়েছে।

আগামী দিনের প্রযুক্তিও আসতে পারে প্রকৃতি থেকেই

ভবিষ্যতের প্রযুক্তি আরও বেশি প্রকৃতিনির্ভর হতে পারে। স্বয়ংক্রিয় রোবট, পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী, কম শক্তি খরচের যান, কৃত্রিম অঙ্গ, স্মার্ট পোশাক, নতুন ধরনের ওষুধ কিংবা জল ও বায়ু পরিশোধনের প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রেই প্রকৃতির কাছ থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞানীরা এখন শুধু প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করছেন না; তাঁরা প্রকৃতির নকশা ও কার্যপ্রক্রিয়ার মৌলিক নীতিগুলো বোঝার চেষ্টা করছেন।

মানুষ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী মনে করে। প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি সেই দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছে। কিন্তু প্রযুক্তির ইতিহাস একটু গভীরভাবে দেখলে দেখা যায়, মানুষের অনেক বড় আবিষ্কারের পেছনে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে প্রকৃতি।

পাখির ডানা মানুষকে আকাশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। বাদুড় শিখিয়েছে শব্দের প্রতিধ্বনি দিয়ে অদৃশ্য জগত বোঝার কৌশল। পদ্মপাতা দেখিয়েছে কীভাবে পৃষ্ঠকে পানিরোধী করা যায়। মাকড়সার জাল দেখিয়েছে হালকা অথচ শক্ত উপাদানের সম্ভাবনা। গেকোর পা দিয়েছে আঠাবিহীন সংযুক্তির নতুন ধারণা। মানুষের মস্তিষ্ক খুলে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দরজা।

তাই আধুনিক প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ হয়তো শুধু কম্পিউটার, রোবট কিংবা মহাকাশযানের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতের বড় আবিষ্কারের অনেকটাই হয়তো অপেক্ষা করছে পাতার ওপর, পাখির ডানায়, সমুদ্রের গভীরে, প্রাণীর শরীরে কিংবা মানুষের নিজের শরীরের ভেতরে।

প্রকৃতি শুধু আমাদের বাসস্থান নয় প্রকৃতিই মানুষের সবচেয়ে পুরোনো গবেষণাগার, সবচেয়ে বড় শিক্ষক এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তির সম্ভাব্য নকশাকার।