একসময় প্রযুক্তিকে মানুষের শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হতো। লিফট, গাড়ি, রিমোট কন্ট্রোল থেকে শুরু করে স্মার্টফোন সবকিছুই মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে করেছে সহজ ও আরামদায়ক। কিন্তু এই আরামের সঙ্গে বেড়েছে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, কম হাঁটা, অনিয়মিত ঘুম এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। ফলে প্রযুক্তি যেমন শরীরচর্চার প্রয়োজন কমিয়েছে, তেমনি এখন সেই প্রযুক্তিই আবার সুস্থ জীবনযাপনের সহায়ক হয়ে উঠছে।
স্মার্টওয়াচ, ফিটনেস ব্যান্ড, মোবাইল অ্যাপ, স্মার্ট স্কেল কিংবা অনলাইন ব্যায়াম প্ল্যাটফর্ম বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন নিজের দৈনন্দিন শারীরিক কর্মকাণ্ডের হিসাব রাখা সম্ভব। কত পা হাঁটা হলো, কতক্ষণ সক্রিয় ছিলেন, ঘুমের সময় কেমন ছিল, কখন পানি পান করতে হবে কিংবা ব্যায়ামের সময় হয়েছে কি না এসব তথ্য ও মনে করিয়ে দেওয়ার কাজ করছে প্রযুক্তি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি নিজে কাউকে সুস্থ করে না। বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি ও তা ধরে রাখতে প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
হাতের মুঠোয় দৈনিক হাঁটার হিসাব
শরীর সুস্থ রাখতে নিয়মিত হাঁটার বিকল্প নেই। কিন্তু ব্যস্ত জীবনে অনেকেই দিনে কতটা হাঁটছেন, তার হিসাব রাখেন না। এখানেই কাজে আসতে পারে স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচ কিংবা ফিটনেস ট্র্যাকার।
এসব ডিভাইস সাধারণত ব্যবহারকারীর হাঁটার সংখ্যা, দূরত্ব ও সক্রিয় থাকার সময়ের আনুমানিক হিসাব দেয়। দিনের শেষে নিজের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে পরদিন আরও কিছুটা সক্রিয় থাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যায়।
তবে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক পদক্ষেপ নিতেই হবে এমন কোনো একক নিয়ম সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, কাজের ধরন ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে। তাই প্রযুক্তিতে দেখানো সংখ্যাকে লক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা গেলেও সেটিকে চূড়ান্ত স্বাস্থ্যমানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
আরো পড়ুন: তথ্যপ্রযুক্তির প্রাণ অনলাইন গণমাধ্যম
স্মার্টওয়াচে নজর হৃদ্স্পন্দনে
স্মার্টওয়াচ এখন শুধু সময় দেখার যন্ত্র নয়। অনেক আধুনিক ঘড়িতে হৃদ্স্পন্দনের হার, ব্যায়ামের সময়কার সক্রিয়তা, বিশ্রামের সময়ের তথ্যসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত ফিচার থাকে।
ব্যায়ামের সময় শরীরের ওপর চাপ কতটা পড়ছে, দিনের কোন সময়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন কিংবা বিশ্রামের সময় হৃদ্স্পন্দনের প্রবণতা কেমন এসব বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যায়।
তবে এখানে সতর্কতাও জরুরি। স্মার্টওয়াচের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য সাধারণত চিকিৎসা নির্ণয়ের বিকল্প নয়। কোনো অস্বাভাবিক ফলাফল বারবার দেখা গেলে কিংবা বুক ধড়ফড়, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা ইত্যাদি উপসর্গ থাকলে ডিভাইসের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ঘুমের হিসাবও রাখবে প্রযুক্তি
শরীর সুস্থ রাখতে ব্যায়ামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমও জরুরি। অথচ আধুনিক জীবনে ঘুমের সময় কমে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার, কাজের চাপ কিংবা অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে অনেকের ঘুমের রুটিন এলোমেলো হয়ে যায়।
স্মার্টওয়াচ ও বিভিন্ন ঘুম পর্যবেক্ষণকারী অ্যাপ ঘুমানোর সময়, জেগে ওঠার সময় এবং ঘুমের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে আনুমানিক তথ্য দিতে পারে। এতে নিজের ঘুমের অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া সহজ হয়।
যেমন প্রতিদিন যদি দেখা যায় যে রাত জেগে থাকার কারণে ঘুমের সময় ক্রমেই কমছে, তাহলে প্রযুক্তির দেওয়া তথ্য ব্যবহার করে ঘুমের রুটিন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া যায়।
তবে ঘুমের অ্যাপের তথ্যকে শতভাগ চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক মাপ হিসেবে ধরা উচিত নয়। দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
পানি পানেও মনে করিয়ে দেবে মোবাইল
শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কর্মব্যস্ততার মধ্যে অনেকেই পানি পান করতে ভুলে যান। এ ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের রিমাইন্ডার অ্যাপ বেশ কার্যকর হতে পারে।
নির্দিষ্ট সময় পরপর নোটিফিকেশন দিয়ে পানি পান করার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে এসব অ্যাপ। কেউ চাইলে নিজের দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী আলাদা সময় নির্ধারণ করে নিতে পারেন।
তবে সবার জন্য একই পরিমাণ পানি পান করার নিয়ম নেই। আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম, খাদ্যাভ্যাস ও ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার ওপর পানির প্রয়োজন পরিবর্তিত হতে পারে। তাই অ্যাপে দেওয়া সাধারণ পরামর্শের পাশাপাশি নিজের শরীরের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
আরো পড়ুন: ভূমি জরিপে প্রযুক্তির ছোঁয়া
খাবারের ওপর নজর রাখবে অ্যাপ
স্বাস্থ্যকর শরীরের জন্য ব্যায়ামের পাশাপাশি সুষম খাদ্যও প্রয়োজন। কী খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং খাবারে কী ধরনের পুষ্টি উপাদান রয়েছে—এসবের হিসাব রাখতে এখন বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করা যায়।
খাবারের নাম ও পরিমাণ লিখে রাখলে কিছু অ্যাপ আনুমানিক ক্যালরি, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের হিসাব দেখায়। এতে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া সম্ভব।
ওজন নিয়ন্ত্রণে যারা কাজ করছেন, তাদের জন্য এ ধরনের অ্যাপ বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে। দিনের খাবারের তালিকা লিখে রাখলে নিজের খাদ্যাভ্যাসের দুর্বল দিকগুলোও সহজে চিহ্নিত করা যায়।
তবে অনলাইন অ্যাপের ক্যালরি বা পুষ্টির হিসাব সব সময় নিখুঁত নাও হতে পারে। বিশেষ কোনো রোগ, খাদ্যসংক্রান্ত সমস্যা বা চিকিৎসাজনিত প্রয়োজন থাকলে পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধু অ্যাপের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
ঘরেই ব্যায়ামের সুযোগ
ব্যায়াম করার জন্য সব সময় জিমে যাওয়া সম্ভব হয় না। সময়ের অভাব কিংবা দূরত্বের কারণে অনেকে নিয়মিত শরীরচর্চা করতে পারেন না। প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রেও তৈরি করেছে বিকল্প ব্যবস্থা।
অনলাইন ভিডিও, ব্যায়ামের অ্যাপ কিংবা ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ঘরেই বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম করা যায়। হাঁটা, স্ট্রেচিং, যোগব্যায়াম, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম কিংবা হালকা কার্ডিও নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন কর্মসূচি বেছে নেওয়া সম্ভব।
তবে অনলাইনে কোনো ব্যায়াম দেখে সরাসরি শুরু করার আগে সেটি নিজের শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে মানানসই কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভুল কৌশলে ব্যায়াম করলে পেশি বা জয়েন্টে আঘাত লাগতে পারে।
নতুন করে ব্যায়াম শুরু করার ক্ষেত্রে ধীরে শুরু করে সময় ও মাত্রা বাড়ানো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কোনো ব্যথা বা অস্বস্তি হলে তা উপেক্ষা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বসে থাকার বিরুদ্ধে প্রযুক্তির সতর্কবার্তা
বর্তমানে অফিস, ব্যবসা কিংবা পড়াশোনার কাজে দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইলের সামনে বসে থাকতে হয়। একটানা বসে থাকা শরীরের জন্য ভালো অভ্যাস নয়।
স্মার্টওয়াচ ও বিভিন্ন অ্যাপ নির্দিষ্ট সময় পরপর নড়াচড়া করার জন্য ব্যবহারকারীকে মনে করিয়ে দিতে পারে। ফলে কাজের ফাঁকে দাঁড়ানো, কয়েক মিনিট হাঁটা কিংবা হালকা স্ট্রেচিং করার অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রযুক্তির এই ছোট্ট মনে করিয়ে দেওয়াই দিনের সামগ্রিক শারীরিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে স্মার্ট স্কেল
ওজন মাপার যন্ত্রও এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। কিছু স্মার্ট স্কেল মোবাইল অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যবহারকারীর ওজনের পরিবর্তন সংরক্ষণ করে। ফলে এক দিনের ওজনের বদলে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের পরিবর্তনের ধারা দেখা যায়।
ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু ওজনের সংখ্যাকে স্বাস্থ্য নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। শরীরের গঠন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্ষমতা ও সামগ্রিক সুস্থতাও গুরুত্বপূর্ণ।
আরো পড়ুন: আসামি ধরতে পুলিশের হাতে আধুনিক প্রযুক্তির ১৫ অস্ত্র
মানসিক সুস্থতায় প্রযুক্তির ব্যবহার
শরীর সুস্থ রাখার আলোচনায় মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। অতিরিক্ত চাপ, উদ্বেগ ও অস্থিরতা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।
মেডিটেশন, শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, রিল্যাক্সেশন ও ঘুমের প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করা যায়। কয়েক মিনিটের মনোযোগভিত্তিক অনুশীলন অনেকের জন্য দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যে কিছুটা প্রশান্তি আনতে পারে।
তবে গুরুতর বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে এসব অ্যাপকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া উচিত।
প্রযুক্তি ব্যবহারে উল্টো ক্ষতি যেন না হয়
স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন উপকারী, তেমনি অতিরিক্ত নির্ভরতাও সমস্যা তৈরি করতে পারে। সারাক্ষণ স্মার্টওয়াচের সংখ্যা দেখা, ক্যালরি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়া কিংবা প্রতিদিন নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ না হলে মানসিক চাপ নেওয়া স্বাস্থ্যকর নয়।
এ ছাড়া মোবাইল ও অন্যান্য স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার নিজেই শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বাড়াতে পারে। ফলে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে নিয়ন্ত্রিত ও সচেতনভাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডিভাইসের তথ্যকে নিজের শরীরের অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। শরীর ক্লান্ত হলে বিশ্রাম প্রয়োজন, ব্যথা হলে কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন এবং কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রযুক্তি সহায়ক, সুস্থতার মূল চাবিকাঠি জীবনযাপন
প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, সুস্থ থাকার মৌলিক নিয়ম বদলায়নি। নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা, পরিমিত ও সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, পর্যাপ্ত পানি পান, ধূমপান ও ক্ষতিকর অভ্যাস এড়িয়ে চলা এবং মানসিক প্রশান্তি এসবই সুস্থ জীবনের ভিত্তি।
স্মার্টওয়াচ আপনাকে হাঁটার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে, অ্যাপ খাবারের হিসাব রাখতে পারে, ফোন পানি পান করার সংকেত দিতে পারে, আর অনলাইন ভিডিও ব্যায়াম শেখাতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাঁটতে হবে আপনাকেই, স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে হবে আপনাকেই এবং সময়মতো ঘুমাতে যেতে হবে আপনাকেই।
তাই প্রযুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক ব্যবহার হলে হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন কিংবা কবজির স্মার্টওয়াচই হয়ে উঠতে পারে নিজের শরীর ও জীবনযাপনের প্রতি আরও সচেতন হওয়ার একটি কার্যকর হাতিয়ার।