মানুষের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে বিজ্ঞান ও ধর্ম দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্র। বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করে। অন্যদিকে ধর্ম মানুষকে সৃষ্টি, স্রষ্টা, জীবন, নৈতিকতা ও অস্তিত্বের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চিন্তা করতে শেখায়। ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনে প্রকৃতি ও সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মানুষকে চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ কারণে বিজ্ঞান ও কোরআনের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও গবেষণা চলছে।

তবে কোরআন কোনো বিজ্ঞানবিষয়ক পাঠ্যবই নয়। এর মূল উদ্দেশ্য মানুষের জন্য হেদায়াত বা পথনির্দেশ। কিন্তু সৃষ্টিজগত সম্পর্কে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত আধুনিক বিজ্ঞানের কিছু আবিষ্কার ও ধারণার সঙ্গে তুলনা করে দেখেন মুসলিম চিন্তাবিদ ও গবেষকেরা। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ, পানি ও জীবন, মানবভ্রূণের বিকাশ, পাহাড়, সমুদ্র, রাত ও দিনের পরিবর্তনসহ নানা বিষয়ে কোরআনের বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচিত।

মহাবিশ্বের সৃষ্টি নিয়ে কোরআনের বক্তব্য

মহাবিশ্বের উৎপত্তি আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়। মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, এর বয়স কত এবং এর ভবিষ্যৎ কী এসব প্রশ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান ধারণা হলো ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্ব একসময় অত্যন্ত ঘন ও উত্তপ্ত অবস্থায় ছিল এবং পরে তা সম্প্রসারিত হতে শুরু করে।

কোরআনের সূরা আল-আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী উভয়েই একত্রে সংযুক্ত ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম?’

এই আয়াতকে অনেক মুসলিম গবেষক মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থা ও পরবর্তী পৃথকীকরণের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে আয়াতটির তাফসির ও ব্যাখ্যা নিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। তাই এটিকে সরাসরি আধুনিক বিগ ব্যাং তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক সূত্র হিসেবে দাবি না করে মহাবিশ্বের সৃষ্টি নিয়ে কোরআনের একটি গভীর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা অধিক সতর্ক অবস্থান।

মহাবিশ্ব কি সম্প্রসারিত হচ্ছে?

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত বিষয় হলো মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—এমন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।

কোরআনের সূরা আয-যারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আকাশ, আমি তা নিজ হাতে নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি তা সম্প্রসারণকারী।’

এই আয়াতের ‘সম্প্রসারণকারী’ শব্দটি নিয়ে মুসলিম গবেষকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। আধুনিক মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সঙ্গে এর একটি সাদৃশ্য রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। তবে আরবি শব্দের ভাষাগত ও তাফসিরভিত্তিক ব্যাখ্যা বিবেচনায় রেখে এ বিষয়ে অতিরঞ্জিত বৈজ্ঞানিক দাবি করা উচিত নয়।

পানি ও জীবনের সম্পর্ক

পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্বের জন্য পানি অপরিহার্য। জীবদেহের বড় একটি অংশ পানি দিয়ে গঠিত। কোষীয় কার্যক্রম, বিপাক, পুষ্টি পরিবহনসহ জীবনের মৌলিক প্রায় সব প্রক্রিয়ায় পানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কোরআনের সূরা আল-আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আমি পানি থেকে প্রত্যেক প্রাণবান বস্তু সৃষ্টি করেছি।’

এই বক্তব্যকে আধুনিক জীববিজ্ঞানের সঙ্গে তুলনা করে দেখা হয়। পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশে পানির ভূমিকা যে মৌলিক, তা বিজ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত। সমুদ্র, নদী, হ্রদ ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

কোরআনে পানিকে শুধু জীবনধারণের উপকরণ হিসেবে নয়, বরং সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে পানি নিয়ে কোরআনের বক্তব্য ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।

মানবভ্রূণের বিকাশ

মানুষের সৃষ্টি ও মাতৃগর্ভে তার বিকাশ সম্পর্কে কোরআনে একাধিক আয়াত রয়েছে। সূরা আল-মুমিনুনে মানুষের সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে শুক্রবিন্দু, আলাকাহ ও মুদগাহসহ কয়েকটি পর্যায়ের বর্ণনা পাওয়া যায়।

আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞান অনুযায়ী, নিষেকের পর মানবভ্রূণ ধারাবাহিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানবদেহে পরিণত হয়। ভ্রূণের বিভিন্ন পর্যায়ে কোষ বিভাজন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশ এবং শারীরিক গঠনের পরিবর্তন ঘটে।

কোরআনের এসব আয়াতের সঙ্গে আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞানের কিছু পর্যায়ের মিল খুঁজে পান মুসলিম গবেষকেরা। তবে আরবি শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থ, প্রাচীন তাফসির এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষার মধ্যে সরাসরি সমীকরণ করা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তাই কোরআনের আয়াতকে আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞানের পূর্ণাঙ্গ পাঠ হিসেবে উপস্থাপন না করাই অধিক যুক্তিসংগত।

পাহাড় ও পৃথিবী

পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক গঠন অত্যন্ত জটিল। ভূত্বকের বিভিন্ন স্তরের নড়াচড়া, প্লেটের সংঘর্ষ ও বিচ্যুতি এবং দীর্ঘ সময়ের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে পাহাড়-পর্বতের সৃষ্টি হয়।

কোরআনের সূরা আন-নাবার ৬ ও ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমি কি পৃথিবীকে বিছানা এবং পর্বতমালাকে পেরেকস্বরূপ করিনি?’

পাহাড়কে পেরেকের সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টি নিয়ে বহু আলোচনা রয়েছে। ভূতত্ত্বে দেখা যায়, কিছু পর্বতের দৃশ্যমান অংশের নিচে গভীর গঠন রয়েছে। তবে পাহাড় পৃথিবীকে স্থির করে রাখে বা ভূমিকম্প বন্ধ করে দেয়—এমন সরল ব্যাখ্যা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

এখানে কোরআনের বক্তব্যকে পৃথিবীর গঠন ও পাহাড়ের বিস্ময়কর প্রকৃতি নিয়ে মানুষের চিন্তার আহ্বান হিসেবে দেখা যেতে পারে।

দুই সমুদ্রের মিলন

কোরআনের সূরা আর-রহমানে বলা হয়েছে, ‘তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেছেন, তারা পরস্পর মিলিত হয়; তাদের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরাল, তারা তা অতিক্রম করে না।’

সমুদ্রবিজ্ঞানে বিভিন্ন জলরাশির মধ্যে লবণাক্ততা, তাপমাত্রা, ঘনত্ব ও প্রবাহের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন ধরনের সীমান্তবর্তী অঞ্চল তৈরি হতে পারে। নদীর মিঠা পানি যখন সমুদ্রের লবণাক্ত পানির সঙ্গে মেশে, তখনও একটি পরিবর্তনশীল অঞ্চল দেখা যায়।

এই প্রাকৃতিক ঘটনাকে কোরআনের আয়াতের সঙ্গে তুলনা করে অনেকে বলেন, সমুদ্রের পানি মিলিত হলেও তার বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় না। তবে ‘অন্তরাল’ শব্দের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। তাই এ বিষয়েও ধর্মীয় বক্তব্য ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের পার্থক্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

রাত ও দিনের পরিবর্তন

পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে দিন ও রাতের সৃষ্টি হয়। সূর্যের আলো পৃথিবীর এক অংশে পড়ার সময় সেখানে দিন থাকে, অন্য অংশে রাত। পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে।

কোরআনে রাত ও দিনের পরিবর্তনকে মানুষের চিন্তার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সূরা আয-যুমারের ৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তিনি রাতকে দিনের ওপর আবৃত করেন এবং দিনকে রাতের ওপর আবৃত করেন।’

এ ধরনের আয়াত মানুষের দৃষ্টি প্রকৃতির দিকে ফেরায়। আকাশ, পৃথিবী, সূর্য, চন্দ্র, রাত ও দিন—সবকিছু নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা করতে উৎসাহিত করে কোরআন।

সূর্য ও চন্দ্র

কোরআনে সূর্য ও চন্দ্রের আলাদা বৈশিষ্ট্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সূর্যকে আলো ও চন্দ্রকে জ্যোতির সঙ্গে সম্পর্কিত করে বিভিন্ন আয়াতে বর্ণনা পাওয়া যায়।

আধুনিক বিজ্ঞানে জানা যায়, সূর্য নিজেই আলো ও শক্তির উৎস। অন্যদিকে চাঁদের নিজস্ব আলো নেই; এটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে দৃশ্যমান হয়।

এ ধরনের বিষয় নিয়েও কোরআনের আয়াতকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তবে প্রাচীন আরবি ভাষায় ব্যবহৃত শব্দগুলোর অর্থ ও প্রসঙ্গ বিশ্লেষণ করা ছাড়া কেবল আধুনিক বৈজ্ঞানিক অর্থ আরোপ করা যথাযথ নয়।

কোরআন কি বিজ্ঞানের বই?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে কোরআনের মূল উদ্দেশ্য বুঝতে হবে। কোরআন কোনো পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের পাঠ্যবই নয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য মানুষের ঈমান, নৈতিকতা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া।

তবে কোরআন মানুষকে জ্ঞান অর্জন, চিন্তা ও পর্যবেক্ষণে উৎসাহিত করে। প্রকৃতির বিভিন্ন নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করার আহ্বান এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে বিজ্ঞানচর্চাকে কোরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

ইসলামের ইতিহাসেও বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। মধ্যযুগে মুসলিম বিজ্ঞানীরা গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও ভূগোলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, ইবনে আল-হাইসামসহ বহু মুসলিম মনীষীর কাজ পরবর্তী বৈজ্ঞানিক জ্ঞানচর্চায় প্রভাব ফেলেছে।

বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের মধ্যে ভারসাম্য

বিজ্ঞান প্রাকৃতিক জগতের ‘কীভাবে’ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করে। কোনো ঘটনা কীভাবে ঘটে, কোন নিয়মে ঘটে, তার কারণ কী—এসব প্রশ্ন পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনুসন্ধান করা বিজ্ঞানের কাজ।

অন্যদিকে ধর্ম মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য, নৈতিকতা, ভালো-মন্দ, দায়িত্ব এবং স্রষ্টার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মতো প্রশ্নের উত্তর দেয়।

তাই বিজ্ঞান ও কোরআনকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে আলাদা ক্ষেত্রের জ্ঞানচর্চা হিসেবে দেখা যেতে পারে। কোরআন মানুষকে প্রকৃতির নিদর্শন পর্যবেক্ষণে উৎসাহিত করে, আর বিজ্ঞান সেই প্রকৃতির কার্যপ্রণালি অনুসন্ধান করে।

অতিরঞ্জিত দাবি থেকে সতর্ক থাকা জরুরি

কোরআনের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—কোনো নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিষ্কৃত হলেই সেটিকে কোরআনের কোনো আয়াতের সঙ্গে জোর করে মিলিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কারণ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সময়ের সঙ্গে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে সংশোধিত বা পরিবর্তিত হতে পারে।

একইভাবে কোনো বৈজ্ঞানিক বিষয় বর্তমানে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না বলে সেটিকে কোরআনের অলৌকিক প্রমাণ হিসেবে ঘোষণা করাও সতর্কতার পরিপন্থী।

বরং কোরআনের আয়াতের ভাষাগত অর্থ, তাফসিরের ঐতিহ্য এবং আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তথ্য—তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা করা প্রয়োজন।

জ্ঞান অনুসন্ধানের আহ্বান

কোরআনে বারবার মানুষকে চিন্তা করতে, পর্যবেক্ষণ করতে এবং সৃষ্টিজগতের নিদর্শন থেকে শিক্ষা নিতে বলা হয়েছে। আকাশের দিকে তাকানো, পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে ভাবা, মানুষের নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করা—এসবই কোরআনের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এ কারণে বিজ্ঞান ও কোরআনের সম্পর্ককে কেবল ‘বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আগে থেকেই কোরআনে ছিল’—এই একমাত্র দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিষয়টির ব্যাপকতা কমে যায়। বরং কোরআনের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক শিক্ষা হতে পারে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার, চিন্তা করার এবং জ্ঞান অনুসন্ধানের মানসিকতা তৈরি করা।

মহাবিশ্বের অসীম বিস্তার, পৃথিবীতে জীবনের বৈচিত্র্য, মানুষের শরীরের জটিলতা কিংবা পানি ও প্রকৃতির অপরিহার্যতা—প্রতিটি বিষয়ই মানুষের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। বিজ্ঞান সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজে পরীক্ষাগারে ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। আর কোরআন এসব সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মানুষকে স্রষ্টার নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানায়।

সুতরাং বিজ্ঞান ও কোরআনের সম্পর্ককে সংঘাতের বদলে জ্ঞান, অনুসন্ধান ও চিন্তার একটি বিস্তৃত পরিসর হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিজ্ঞান মানুষের সামনে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করে চলেছে, আর কোরআন সেই মহাবিশ্ব ও মানুষের অস্তিত্বের অর্থ নিয়ে ভাবতে আহ্বান জানায়। জ্ঞান যত বিস্তৃত হবে, মানুষের সামনে প্রশ্নও তত বাড়বে—আর সেই প্রশ্নের অনুসন্ধানই মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রার অন্যতম চালিকাশক্তি।